Home / অন্যান্য / একাকীত্ব : নলিনী চৌধুরী

একাকীত্ব : নলিনী চৌধুরী

আমার প্রেমিকের নাম একাকীত্ব। ও আমাকে প্রতিনিয়ত ভালবেসে যায়। এতটাই ভালবাসে যে আমি তার মধ্যেই হারিয়ে যাই। সে আমাকে ভাবতে শেখায়। তার মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। নিজেকে চেনার জন্য সারাজীবনই সে আমার সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে। তাকে আমি গভীরভাবে ভালবাসতে গিয়ে নিজেকে ভুলে গিয়েছি, আমার অস্তিত্বকে ভুলেছি, কখনো কখনো নিজেকে ধ্বংস করে দিয়েছি। কিন্তু সে কি আমার শক্তিশালী আমার আমাকে বের করার জন্যই যথেষ্ট ছিলনা? নিজেকে শেষ করে দিয়ে একাকীত্বকে কেবল অপমান করেই, নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছি। সে যদি না থাকতো, আমি যন্ত্রণা নামক অসহায় আমার আমিটাকে কি সহযোগিতা করতে শিখতাম? আমি কি রাত জেগে তারার মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়াতাম? আমি কি কখনো কবি হতে চাইতাম? না, আমার সময় ছিলনা। ব্যস্ততার বেড়াজালে আমি কিছুই হতে পারতাম না। একাকীত্ব না থাকলে আমি কোকিলের সুমধুর কণ্ঠকে অনুধাবন করতে পারতাম না। আমি প্রেমিকা হতে পারতাম না, আমি প্রেমিক চিনতাম না। আমি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে জানতাম না। কোন প্রেমিকের তিলে তিলে অবহেলাকে অনুধাবন করতে পারতাম না। আমার হৃদয়গহীনে প্রতিনিয়ত হাতুড়িপেঠা অপমান আঘাত হানতোনা। প্রিয়তম একাকীত্ব, তুমি না থাকলে আমি নির্যাতিতের কষ্ট বুঝতাম না। আমি ধ্যান মগ্ন হয়ে জীবনের সান্নিধ্য খুঁজে বেড়াতাম না। আমি মরতে চাইতাম না, বাঁচতেও চাইতাম না। আমি পরিবর্তন হতাম না। আমি হতাশ হতাম না, আমি আশা খুঁজতাম না। তুমি আছো বলে আশা আছে, ভরসা আছে, হতাশাও আছে। জয় আছে, পরাজয় আছে। তুমি আছো বলে আমি অন্যকে জানতে গিয়েছি। তুমি আছো বলে আজ সংগ্রাম শিখেছি। তুমি আছো বলে অস্তিত্ব রক্ষার নেশায় মেতেছি। তুমি সর্বদা আমার একজন যোগ্য অভিভাবকের মতো কাজ করে গেছো। তুমিই নাড়া দিতে পেরেছো আমার বিবেককে। তুমিই আমায় ভয় দেখিয়েছো, তুমিই আমায় সাহস যুগিয়েছো। তুমি আলো নিভিয়ে অন্ধকার দিয়েছো, আবার আলোর সন্ধান দিয়েছো। তুমি বন্ধু হয়েছো, শত্রু হয়েছো। কাঁদিয়েছো, চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছো সকলের অগোচরে, হাসিয়েছো, আনন্দও দিয়েছো। শূন্যতা দিয়েছো, পরিপূর্ণতা দিয়েছো। ব্যর্থতা দিয়েছো, সফলতা দিয়েছো। তুমি আছো বলেই জ্বালা আছে, যন্ত্রণা আছে, মুক্তিও আছে। তুমি আছো বলেই মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করেছি। একা চলতে শিখেছি, একাই মনোবল রাখতে শিখেছি, ভালবাসতে শিখেছি, ত্যাগ করতে শিখেছি, ঘৃণা করতে শিখেছি। জানো, যেদিন তুমি আমায় প্রথম ভালবেসেছিলে, তোমার ভালবাসাকে গ্রহণ করতে পারিনি। তুমি রাগ করেছিলে বলে আরো পাশে চলে এসেছিলে। বারবার চেষ্টা করেও তোমাকে অবহেলা করতে পারিনি। জানি তুমি আজীবন আমার সঙ্গী হয়েই থাকবে। সামান্য কিছু সময় জীবনের তাগিদে হয়ত আমাকে ছেড়ে যাবে। কিন্তু তুমি আমারই। তুমি আমার নিশিথের সঙ্গী। দিনের আলোয় তোমাকে আরো স্পষ্ট দেখি আজকাল। তোমাকে ভালবাসি বলেই আজকাল বেঁচে আছি। যখন ভালবাসতাম না, তুমি খুব করে জড়িয়ে ধরতে, তারপর বলতে ভালবাসি, আমি অস্বস্তিবোধ করতাম। তোমাকে অবহেলা করে যাদেরকে আপন ভেবেছি, কেউই আপন ছিলনা। দিনশেষে তুমিই ছিলে সঙ্গী। সব মিথ্যে হয়ে গেলেও তুমি মিথ্যে হওনি, তুমিই সত্য। তুমি আমার শক্তি হয়ে আজ দিবস রজনী আমার সাথে বাস করছো, অথচ তুমি ছাড়া যাকে আপন ভেবেছিলাম, সেই আমাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। আমি যদি তোমাকে না চিনতাম, তাহলে কী সর্বনাশটাই না করে ফেলেছিলাম! একাকীত্ব, তুমি আমার কতটা শক্তি, কতটা প্রেরণা তা এ জগৎ না বুঝলেও আমি জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই বুঝতে পেরেছি। জানো, তোমাকে সবাই ভালবাসতে জানেনা বলেই পৃথিবীতে এত অসঙ্গতি। তারা পৃথিবী থেকে তোমাকে তাড়িয়ে দিতে চায়। অথচ তুমি না থাকলে পৃথিবী এত সুন্দর হতোনা, মানুষ এত প্রিয় হতোনা, প্রেমিক এত দামী হতোনা। তুমিই সবকিছুকে মূল্যবান করে দিয়েছো, অথচ কেউই তোমার মূল্য দিতে চায়না। তুমি আমার শ্রেষ্ঠ সঙ্গী হয়েই আমার পাশে থেকো আজীবন। পৃথিবীতে কেউ হতে পেরেছে কে ই বা কার আপন? তবুও এ পৃথিবী চলছে তোমাকে তাড়িয়ে দেবার নেশায়, হাস্যকর এ জগতের লীলা বুঝা দায়! জানো, যেদিন প্রথম স্বপ্ন দেখেছিলাম সেদিন তোমার কথা মনেই হয়নি। তুমি বারবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলে, ভেবেছি তুমি ক্ষণস্থায়ী, একটু পরেই হয়ত মরে পড়ে রবে। কিন্তু আজ জানি, তুমি অমৃত অমর। তোমার স্বাদ গ্রহণ করতে পেরেছি বলে আমি এ পৃথিবীর স্বাদ বুঝতে পারি। তোমাকে ভালবাসিনি বলেই এমন রাগ করেছিলে? আর কখনো এমন হবেনা, আমি সবসময় তোমাকে ভালবেসে যাবো। তুমি খুশি হয়ে মাঝেমাঝে আমাকে রেখে চলে যেতে পারো, তবে আবার ফিরে এসো। তুমিই আমার একমাত্র ঠিকানা, তুমি ছাড়া এ আমি পরিচয়হীনা। তুমি আমার হৃদয়ের জন্ম দেও প্রতিনিয়ত, আমি আমার সেই হৃদয় নিয়ে খেলতে থাকি। তুমি আমার একমাত্র খেলার সঙ্গী হও। জেনে নিও আমি তোমার আজীবন প্রেমিকা, তোমার সঙ্গে আছি। তুমি আছো বলেই জ্ঞান তার গভীরতার সীমাবদ্ধতা হারিয়েছে। তুমি আছো বলেই আমি সাতার কাটতে শিখেছি, তুমি সমূদ্র হয়ে আমায় সাতার কাটতে শিখিয়েছো। তুমি আছো বলেই পৃথিবীকে তুচ্ছ মনে হয়েছে। তুমি আছো বলেই মানুষের মধ্যে বাঁচতে চেয়েছি, কাউকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে উন্মাদ হয়েছি, দিনশেষে নিঃস্ব হয়েছি। তোমার জন্যই জীবনের জটগুলো অদ্ভুত ছিল, তোমার জন্যই জীবন এত কঠিন, জীবন এত সহজ। তোমার জন্যই জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে শিখেছি, তোমার জন্যই জগতের মধ্যে হারিয়ে যেতে শিখেছি। তোমার জন্যই আমার ভিতরের আমিগুলোকে জাগ্রত করার প্রয়োজন হয়েছিল। তুমি আছো বলেই জীবন এত বৃহৎ, এত অপ্রয়োজনীয়, এত প্রয়োজনীয়। তুমি আছো বলেই আমি পৃথিবীর মানুষ হতে পেরেছি, নাহলে হয়ত নির্দিষ্ট কারো হয়ে যেতাম। তুমি আছো বলেই আমার কোন বেড়াজাল নেই, আমি ইচ্ছেমতো আকাশে উড়ি, বাতাসে খেলি। তুমি আছো বলেই প্রতিটি প্রাণীর জীবনই আমার কাছে মূল্যবান। তুমি আছো বলেই জীবনের অর্থ খুঁজি। তুমি আছো বলেই স্মৃতি সুন্দর, কল্পনা সুন্দর, হারানো সুন্দর, ভুলে যাওয়া সুন্দর। তুমি আছো বলেই নতুনও এত সুন্দর। তুমি আছো বলেই চাওয়া পাওয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি। তুমি ছাড়া জীবন চলেনা। তুমিই জীবনকে অস্তিত্বশীল করো। তুমি বিষাক্ত সাপের মতো যখন ছোবল দেও, তখন তোমার বিষদাঁতটাকে অনুধাবন করি। যখন সিংহের মতো গর্জে ওঠো তখন সাহসী জানোয়ারটাকে অনুধাবন করি। যখন কারো প্রেমকে হত্যা করতে যাই, তখন তুমিই আমাকে ভয় দেখাও হত্যা করবে বলে। আমাকে অসহায় করে দিয়ে বুঝাতে চাও, আমার যা ইচ্ছা তা করার অধিকার নেই। আমি বুঝতে পারি। এ তুমিই আমার সবচেয়ে আদর্শ শিক্ষক। তোমার শাসন আমাকে মানুষের স্তরে বাঁচিয়ে রাখতে সহযোগিতা করে গেছে প্রতিনিয়ত। তুমি হৃদয়ঙ্গমে আগুন জ্বালিয়েছো, নিভিয়েছো, ফুটিয়ে তুলেছো ফুল। অবশেষে তুমি আমার চিন্তার দ্বার খুলে দিয়ে সভ্যতার পথ দেখিয়েছো। তুমিই আমার আশীর্বাদ। পাশে থেকো প্রিয়।
.
লেখা : ১৭ অক্টোবর ২০১৬

About Abu Rayhan

আরও দেখুন

16807761_108883132969378_7659074573731222117_n

আঞ্জুমন আরা’র দু’টি ছড়া

আঞ্জুমন আরা’র দু’টি ছড়া খুকুমনির বই মেলা।   বই মেলাতে যাবে খুকু বায়না ধরেছে, গোমরা …

Leave a Reply