Home / ছোটগল্প / ভুল প্রণয়-ফখরুল হাসান

ভুল প্রণয়-ফখরুল হাসান

ভুল প্রণয়

_________________
ফখরুল হাসান

দীর্ঘ তিন বছর পর জেল থেকে আজ মুক্তি পেল  সজীব ! আজ আর সেই সজ্জিত সবুজ পাতার সজিবতা নেই সজীবেরর ভেতর ,  প্রকৃতির মতো সবুজ , ফুলের মতো স্নিগ্ধ যুবক , সজীবের জীবন এখন   শহরের দূষিত বাতাসের চেয়েও বিষাক্ত ।প্রচণ্ড ঘৃণা আর অভিমান হচ্ছে নিজের উপর । জীবন থেকে নষ্ট হয়ে গেল মূল্যবান তিনটি বছর । তিন বছর জেল একজন স্টুডেন্ট এর জন্য কতো টা দীর্ঘ সময় শুধুমাত্র একজন স্টুডেন্টই বুঝতে পারে । যদিও বিনা দোষে জেল কেটেছে সজীব । জেল থেকে বের হয়ে চার পাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখলো সজিব ! এই তিন বছরে ঢাকা শহরে অনেক পরিবর্তন এসেছে ! ঢাকা শহর আগের তুলনায় এখন অনেক পরিষ্কার চিমছাম গোছালো ! হয়তো নতুন নগর পিতা শহরের সৌন্দর্যের  জন্য উনার মেধা এবং শ্রমজীবিদের শ্রম দিয়ে শহরের পরিবেশ সুন্দর করেছেন । মন মেজাজ ভালো নেই সজীবের । তবুও মনে মনে নগর পিতা ধন্যবাদ দিলো সজীব । পরিবর্তন এসেছে সজিবের জীবনেও ! কিন্তু ঢাকা শহরের মতো গোছানো নয় । সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেল একটি ভুল সিদ্ধান্তে । আর ভাবতে পারছে না সজিব ! অতীত এই মূহুর্তে সজীবের কাছে যন্ত্রণা ! আর যন্ত্রণার আরেক নাম নীলা ! জেল গেট থেকে বের হয়ে মেইন রোর্ডে এসে, সজীবের মনে হলো মুক্ত আকাশের নিচে অনেকদিন হাঁটা হয়না !  কিছুক্ষণ হেঁটে ক্লান্ত হয়ে রিক্সায় উঠলো সজীব ! রিক্সায় উঠে ভাবতে লাগলো,যে নীলুকে ভালোবেসে বিয়ে করলো, সেই কি না ভুল বুঝে সজীবকে ছেড়ে এখন অন্যের বাহু ডোরে দিব্যি সুখে আছে ! অথচ তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট এর সেরা স্টুডেন্ট সজীবের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছে নীলু ! মপস্বল শহর থেকে ঢাকা এসেছিল উচ্চ ডিগ্রি নিতে সজীব । তেজগাও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলতার সাথে সে অনার্স শেষ করে , মাষ্টার্স ফাইনাল বর্ষে এসেই নীলার সাথে প্রেম হয় । খুলনা শহরের ধনী বাবার একমাত্র মেয়ে নীলা । বাবা ব্যাংকের ম্যানেজার , খুলনা শহরে বেশ কয়েকটি বাড়ি আছে নীলাদের । আর সজীব এর বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে , বাবা আব্দুর সালাম দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরি করেন । চাকরি জীবনে একটি টাকাও অবৈধ পথে আয় করেনি । অথচ উনার জুনিয়র অনেকই , অবৈধ পয়সা কামিয়ে বাড়ি গাড়ির মালিক হয়েছে  সালাম সাহেব এর চোখের সামনেই । ইচ্ছে করলে তিনি ও পারতেন । কিন্তু ধর্ম ভীরু মানুষ তিনি তাই সারাজীবন সরকারি বেতনে সংসার চালিয়েছেন । দুইটি মাত্র সন্তান । মেয়ে রুনার বিয়ে দিয়েছেন ধার্মিক ছেলের কাছে । এখন যতো চিন্তা সজীব কে নিয়ে ।মামা নামেন পল্টন আইয়া পড়ছি।
রিকশায় চড়ে পল্টন এসে পড়লে রিকশাওয়ালার কথায় ধ্যান ভাঙলো সজীবের , রিকশায় বসে কখন যে নিজের অজান্তেই অতীতে ফিরে গিয়েছিল নিজেই বুঝতে পারেনি । পল্টন নেমে বাসে উঠে সজীব যাবে ফার্মগেট , যৌবনের বেশ কিছু বছর কাটিয়েছে সেখানে । পরিচিত বন্ধুদের অভাব নেই সেখানে ! তাই আজকের রাত্রিযাপন হয়তো কোন বন্ধুর বাসায় বা ম্যাসে কাটিয়ে সকালে কিশোরগঞ্জ নিজের শহরের রওনা দিবে । এইসব ভাবতে ভাবতে আবার অন্য মনস্ক হয়ে গেল সজীব । আবার চোখের সামনে ভেসে উঠে নীলার সাথে কাটানো সময়গুলো । খুলনা থেকে প্রথম যেদিন ঢাকায় আসে নীলা সেদিন ঢাকা শহরের কিছুই চিনতো না । হঠাৎ একদিন ক্যানটিনে দেখা হয় নীলার সাথে সজীবের । খাবারের বিল দিয়ে গিয়ে পরিচয় , একশত টাকার খাবার খেয়ে , এক হাজার টাকা নোট দিল নীলা , কিন্তু ক্যানটিন বয়ের কাছে ভাংতি নেই । আর নীলার কাছে খুচরা টাকা নেই । বিষয়টি খাবার টেবিলে বসে লক্ষ্য করলো সজীব , খাবার শেষে সজীব টাকা দিতে চাইলো । নীলা বাধা দিয়ে বললো , আপনি কেন টাকা দিবেন ? উত্তরে সজীব বললো আপনার কাছে তো ভাঙতি নেই, তাই আমি দিয়ে দিচ্ছি । নীলা চিন্তা করলো । ব্যাপার টি আসলেই ঠিক, আমার কাছে তো সত্যিই ভাঙতি নাই । আচ্ছা নিতে পারি একটি শর্তে , যদি আপনার দেওয়া টাকা ফেরত নেন । সজীব বললো ওকে নেব । এভাবেই দুইজনের প্রথম পরিচয় হয়েছিলো ,পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব , তার পর গভীর প্রেম, প্রেমের প্রপোজালটি নীলার কাছ থেকেই আগে এসেছিল । ইতি মধ্যেই দুইজন দুইজন সম্পর্কে সবকিছু জেনেছে । গভীর প্রেম দুইজনের মাঝে , একজন যেন অন্য জন কে না দেখলে পাগল হয়ে যায় । এদিকে এগিয়ে এলো তাদের পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার সময় । আর বাড়তে থাকে নীলার চাপ , সজীবকে বারবার নীলা বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছে  , সজীব নীলা কে বোঝাতে চায় আমাদের দুইজনের রেজাল্ট বের হওয়ার পর  ভালো একটি  চাকরি হলেই আমরা বিয়ে করবো ! কিন্তু কিছুতেই সময় দিতে চাইলো না নীলা । কারণ বাবার আদেশ ইউনিভার্সিটি বন্ধ হলেই নীলাকে খুলনা চলে যেতে হবে । সজীব ভেবেছে  দুইজনের রেজাল্ট বের হবে , দুইজনই ভালো চাকরি করবে ।বিয়ে করে সুখের হবে তাদের দাম্পত্য জীবন । কিন্তু স্বপ্ন পূরণ করার সময় দিলো না নীলা । অনেকটা নীলার চাপে পড়েই কাউকে না জানিয়ে  গোপনে বিয়ে করে  নীলাকে । বেশ কিছু দিন ভালোই চলছিল তাদের সংসার জীবন । সজিব বিভিন্ন কোম্পানি এবং সরকারি বেসরকারী ব্যাংকে চাকরির জন্য চেষ্টা করছে । আর সংসার চলছে দুইজনের বাড়ি থেকে আসা টাকা দিয়ে । মাষ্টার্স এর রেজাল্ট বের হলো ।দুইজনেরই রেজাল্ট ভালো হলো । কিন্তু  খুশি আর খুশীতে  পরিণত হলো না ! কারণ নীলাকে খুলনা যেতে হবে । ঢাকায়  আর থাকা সম্ভব নয় ! স্বামী স্ত্রী হয়েও পরিবারকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করার কারণে আলাদা হয়ে যেতে হল তাদের।  খুলনা চলে গেল নীলা। আর সজীব কিশোরগঞ্জ ! কিন্তু খুলনা আর কিশোরগঞ্জ বর্তমান সময়ে কোন দূরত্ব নয় প্রযুক্তির এই যুগে ! নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে সজীব আর নীলার ! এদিকে  পারিবারিক ভাবে নীলার বিয়ে ঠিক করেছে নীলার পরিবার ! নীলা সে খবর দিলো সজীব কে ! কিন্তু সজীবের তো এখনও চাকরি হয়নি ! বর উচ্চ বংশের ধনী বাবার ব্যবসায়ী ছেলে । খুলনায় বেশ কয়েকটি চিংড়ি গের  আছে। বেশ কিছু লবণ এবং বরফ কারখানাও আছে । ঢাকায় আছে একটি বাড়ি এবং বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান , সজীব কে সব বিস্তারিত জানালো নীলা , কিন্তু এই মূহুর্তে সজীবের কিছুই করার নেই !  কারণ এখনও সে বেকার , অবশ্য ইতি মধ্যে সরকারি চাকরির জন্য মোটা অংকের টাকা সালামি দিয়েছেন সরকারি দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতার পি এস কে ! বাবার জমানো সব টাকা দিয়েছে চাকরি নামের সোনার হরিণ ধরতে ! কিন্তু কবে হতে সেই সোনার হরিণ এর মালিক তাও সজীবের এই মূহুর্তে জানা নেই । এই দিকে নীলার বিয়ে ফাইনাল হয়ে গেছে ! কিন্তু সজীব এখনও কিছুই করতে পারেনি ! যেহেতু বিয়ের বিষয়ে কিছুই জানেনা নীলার পরিবার তাই নীলা আর সজীবের অপেক্ষা না করে গোপনে সজীব কে তালাক নামা পাঠিয়ে দেয়  । নীলার তালাক নামা হাতে পেয়ে পাগলের মতো ছুটে যায় সজীব খুলনা ! কাজের  কাজ কিছুই হলো না উল্টো সজীব কে ইভটিজিং এর দায়ে পুলিশে দিলো ! ইভটিজিং শব্দটি এই মূহুর্তে সমাজে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ! আর সেই মামলাই সজীবের নামে করে বসে নীলা । ফলাফল সজীবের জীবনে নেমে এলো অন্ধকার কারাবাসের জীবন । অথচ সজীবই ছিলো এক সময় নীলার জীবনের প্রাণ ভ্রমরা ! উহ আর ভাবতে পারছি না নীলা মানেই এখন যন্ত্রণার অপর নাম,
ফার্মগেট গাড়ি থামলে হেলপারের ডাকে হুস হলো সজীবের ! ফার্মগেট নেমে চিন্তা করছে সজিব , এখন কোথায় যাওয়া যায়? ইউনিভার্সিটির সবচেয়ে কাছের প্রিয় বন্ধু রকির বাসায় যাওয়া যায় ! রকি সজীবের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু ছিলো ! রকির বাসায় গিয়ে কলিং বেল চাপ দিতেই বেড়িয়ে এলো কাজের মেয়ে !
ভাইজান কার কাছে আইছেন ?
রকির কাছে কাজের মেয়ে কে বললো সজীব ! আপনে একটু দাঁড়ান আমি ভিতর থাইকা জিজ্ঞায়া আহি। কাজের মেয়ের আর রকির সব কথা শুনেছে সজীব । কারণ ভুল করে দরজা না লাগিয়ে মেয়েটি দ্রুত চলে গিয়েছিল ভিতরে । রকির কথা শুনে অবাক হলো সজীব এখন আর ইচ্ছে করছে না রকির সাথে দেখা করতে ! সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুটি যদি ভুল বুঝে বাজে মন্তব্য করে ! অন্য বন্ধুদের কাছে গেলে কি হবে তা সজীবের বুঝতে কষ্ট হয়নি ! মাস্টার্স শেষ করে যেখানে ভালো একটি চাকরি নেওয়ার কথা, সেখানে আজ জেল ফেরত আসামি সজীব , জীবনের চরম ভুল হয়েছে ছাত্র জীবনে  বিয়ে করে । হায়রে প্রেম ! এই মূহুর্তে নিজের প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা হচ্ছে সজীবের  । ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নেমে চিরচেনা ঢাকা শহরে সূর্য ডুবে অন্ধকার নেমে এলো !  ক্লান্ত শরীর নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সজীব উদ্দেশ্যহীন ভাবে  ………..

About এম মোস্তাকিম বিল্লাহ্

আরও দেখুন

16807761_108883132969378_7659074573731222117_n

আঞ্জুমন আরা’র দু’টি ছড়া

আঞ্জুমন আরা’র দু’টি ছড়া খুকুমনির বই মেলা।   বই মেলাতে যাবে খুকু বায়না ধরেছে, গোমরা …

Leave a Reply