Home / ছোটগল্প / রিক্ত হস্তে ফেরো–অনিতা হাবীব

রিক্ত হস্তে ফেরো–অনিতা হাবীব

রিক্ত হস্তে ফেরো

10537159_1446276162345114_8680883372467080610_n
—–অনিতা হাবীব 

রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে, চারদিক থেকে ফজরের আজানের সুমধুর ধ্বনি অবাচিমলয়ে ভেসে আসছে।বুকের ভিতর ধরফর করে উঠল সারা রাত নয়ন যুগলে একবিন্দু ঘুম আসেনী।রাতে মুর্হুতের জন্য হলেও ঘুম আর চোখে মিলন হয়নী,মনে হয় আঁখি যুগলের ঘুম ডাকাতি হয়ে গেছে ।
সারা রাত নিশী’কে নিয়ে নানা ভাবনায় পার হয়ে গেল সৈকতের ।সৈকত এক মূর্হুতের জন্য নিশীকে ভুলতে পারছে না । অনিচ্ছাসত্ত্বেও সৈকত ক্ষনকাল পরে শয্যা ত্যাগ করে চলেগেল বনবিথীকায়।নানা রকম মালঞ্জে হাত বুলাতে বুলতে মনে পরল সেই তিন বছর পূর্বেকার এক চৈত্রের পূর্ণিমা রাতের কথা ।
সেই রাতে সৈকত নিশিকে নিয়ে এক পুষ্পমালঞ্জে কাটিয়েছিল, তখন এই পুষ্পই মন মুগ্ধকর সুভাষবিলিয়ে পরিবেশটা আরও মধুরতর করে দিয়ে ছিল।সৈকতের মনের রঙ্গিন পর্দায় ভেসে উঠতে লাগল।অতীতের ফেলে আসা সহস্র মধুময় স্মৃতিতে জরানো দিনগুলি।মনে পরল উষ্ণপরশ বিনিময়ের হাজারও কথা ।
সৈকত ফুলের দিকে তাকিয়ে যেন দেখতে পেল হারিয়ে যাওয়া ভালবাসার নিশি’কে —
ভাবতে লাগল সৈকত, নিশির সঙ্গে প্রথম পরিচয় হওয়ার কথা।ফাগুনের কোন একদিন একপ্রাণ প্রিয় বন্ধু মুন্না’র সাথে গিয়াছিল তার এক বোনের শ্বশুর বাড়ী।বাড়ী ছিল শহর থেকে অনেক দূরে, বলতে গেলে অজপাড়া গাঁ।সৈকত ওখানে যাবার পরে নিশী,ঝর্না,চম্পা ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় মুন্না ।মুন্না জানে সৈকত ওদের সাথে পরিচয় হলে,গল্প করে বেশ আনন্দ পাবে । মুন্না সৈকতের সাথে একই ইয়ারে পড়ে এবং র্কাজন হলের একই রুমে থাকে ।
সৈকত কখনও গ্রাম দেখেনী,দেখেনী বসন্তে গ্রামের প্রকৃতিদৃশ্যাবলীও।শোনেনী কখনও বসন্ত পাখির কুহু-কুহু ডাক ও। লোক মুখে যে টুকু শুনেছে আর বই পুস্তকে পড়েছে যে,-বসন্ত এলে কোকিল কুহু কুহু সুমধুর কন্ঠে ডাকে এই টুকু-ই যা।সৈকত যেন কল্পনার এক রাজ্যে হাজির হল। এমন ঋতুতে সৈকতের সঙ্গে নিশীর পরিচয় হয়ে ছিল, যে- ঋতুকে কবি-সাহিত্যিকগন “ঋতুরাজ” বলে আগ্যায়িত করেছেন।সেখানে গিয়ে সৈকত বহু রুপ কথা শুনেছে,বহু জমিদারদের অত্যাচারের গল্প শুনেছে।সৈকতের অভ্যাস মত পুরানো কৃর্তি দেখতে যাওয়ার প্রোগ্রাম হল।সৈকত,নিশি মুন্না,চম্পা,ঝর্না ওরা সবাই মিলে একদিন ভাওয়াল রাজার বাড়ী দেখতে গেল।যেখানে একটা দিঘীর চারপাশে শান বাধাঁনো ঘাট রয়েছে,সেই রাজার আবাস গৃহ চুন-শুরকি দিয়ে বিশ বাইশ হাত পুরোবিল্ডিং।ওখানে ছিল তিন শত পয়শাট্রিটা কক্ষ অর্থাৎ এক বছরে যতো দিন, ততোটা কক্ষ ,ভিতরে ছিল বিশাল জলসাঘর ।
বড় একটা যাদুঘর রয়েছে, সেখানে শ্বেত পাথরে খোদাই করা বহুরকম ভার্স্কয রয়েছে, রয়েছে সেই রাজার ব্যবহৃত নানা রকম তৈজসপএ।ঘুরে ঘুরে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে দেখতে বেলা প্রায় পাঠে বসছে।দিবসের ক্লান্তিতে প্রভাকর রক্তিম বসনে পশ্চিমাকাশে অন্তিম শয্যায়।গোধুলীবেলায় পাখীরা আপন কূলায় ফিরছে।রবি ঠাকুরের কবিতা মনে পড়ে যায়–“এখনই আঁধার হবে বেলা টুকু পোহালে” ।
সবাই ওরা চিন্তায় মগ্ন বাড়ী ফিরতে প্রায় এক প্রহর রাত হয়ে যাবে।অন্ধকারে এতো পথ কি ভাবে যাবে ? সবাই কায়মনচিত্তে মহানদয়ালু প্রভূকে স্বরন করতে লাগল।কেউ আবার দোয়া-কালাম পড়ে গা’য়ে ফুক দিল জ্বিন-ভুতের ভয়ে। সৈতক ভয়ে ফুলে একজনে তিন জন হয়েছে।জন্মের পরে এতো ঘোর অন্ধকার কখনও দেখনী।একে তো আধাঁর তার পর আবার গ্রামের পথ । সংকিত চিত্তে ক্ষানিকটা পথ সামনে এসে বাড়ীর পুরাতন বৃক্ষরাজি যখন পার হয়ে সুবিশাল উন্মুক্ত গগনের নিচে আসল তখন দেখতে পেল –র্পূব গগনে অংশু উজ্জ্বল হয়ে কৌমুদীপতি উদয় হচ্ছে ।সে দিন ছিল পূর্ণিমা রাত।তাই বড় গোল থালার মত কৌমুদিপতি উদয় হয়ে ধরনী’র আধাঁর পিছু হটাতে লাগল।সবাই হৃত আনন্দ ফিরে পেল,মুখে হাসি ফুটল,আনন্দ যেন আরো দ্বিগুন বারল।কিন্তু সৈকতের চাদঁ বদন খানা মলিন,সবার সাথে তাল মিলিয়ে হাটতে না পেরে একটু পিছনেই পরে আছে।আস্তে আস্তে সৈকত পিছনেই পরছে,এক সময় দেখল-সৈকত সবার থেকে অ-নে-ক পিছনে পরে আছে হাফসায়ে উঠে ডাক দিল —
-মুন্না,আমি আর হাটতে পারছি না ।তোরা একটু আস্তে হাট ।
সৈকতের ডাক সুনে সবাই পশ্চাতে তাকায়ে দেখল সে তাদের থেকে অ নে-ক-টা দুরে পরে আছে।সবাই দাঁড়াল।সৈকতের অবস্থা দেখে নিশী’র খুব মায়া হল–বেচারা আমাদের বাড়ীর মেহমান, তার পর গ্রামের পথে আমাদের সাথে বেড়াতে এসেছে, অথচ সবার পশ্চাতে পরে আছে তাকে রেখে আমরা সবাই অগ্রপথিক হওয়া ঠিক হবে না। এ সব ভেবে নিশী বলে উঠল
–ভাইয়া আমি দাড়িঁয়েছি, আপনি আসুন ভয় নেই।
এ বলে নিশী সৈকতের দিকে পথ আগাল ।সবাই অগ্রপথিক বলে নিশী আর সৈকত পশ্চাতে আস্তে আস্তে পথ চলতে লাগল ।
নানা ধরনের কথার মাঝে দু’জনে দু’জনারই ব্যক্তিগত পরিচয় বিনিময় করল।নিরবে চলতে চলতে সৈকত শান্ত নম্র কন্ঠে এক সময় সৈকত বলে উঠল –
-“নিশী” তোমার সাথে আমার কিছু জরুরী কথা আছে ।
-আচ্ছ,ভাইয়া কি জরুরী কথা এখন বলেন।কথার মাঝে আমাদের পথ ফুরিয়ে যাবে ।
আবার নিরবে দু’জনে পথ চলতে লাগল,হাসি তামাসায় ওদেরমধ্যে বেশ জমে উঠেছে।
নিশী বলল –
–ভাইয়া আপনি যেন কি জরুরী কথা বলবেন এখন বলেন।যদি কোন সমস্যা না থাকে, বাড়ীতে ফিরতে তো এখনো অনেক সময় বাকী ।
আবার নিরবে কিছু সময় কাটল, নিরবতা ভেঙ্গে সৈকত বলে উঠল –
-নিশী, তোমাকে আমার খুব ভাললেগেছে জীবনে অনেক মেয়ে দেখেছি কিন্তু তোমার মত আর কাউকে এমন ভাল লাগেনী। তোমার অজান্তেই তোমাকে আমি ভালবেসে ফেলেছি নিশী ।তুমি কি আমার ভালবাসায় সারা দিবে না?
-–নিশী চুপ থেকো না কিছু একটা বলো ।
সৈকতের কথাগুলো শুনে নিশী চমকে গেল মনে হয় যেন “বিনা মেঘে একপ্রকার বজ্রপাত”, বিশলি ভূমন্ডল তার মাথায় কেউ চেপে দিয়েছে,বিব্রত হয়ে নিশী আর কিছু বলতে পারল না, লজ্জায় যেন আরিষ্ট হয়ে গালদুটো যেন রক্তিম হয়ে গেল রাত বলে তা আর দেখা গেল না।নিশী চুপ হয়ে গেল।আর কোন কথা বলল না।ওদের কথা শেষ হতে না হতেই বাড়ী এসে পৌছাল সবাই।

ভোর হতে না তেই নিশী পূর্বে কার দিনের মত চা’ নিয়ে হাজির হল না।নিশী কোন ভাবে সৈকতের সামনে পরছে না। সামনে না আসার কারন খুজতে লাগল সৈকত, ভাবল গত রাতের কারনে হয়তে সে এমন করছে।সারা দিন কোন ভাবেই নিশী’কে ভালভাবে একনজর দেখার সৌভাগ্য হল না সৈকতের।রাতে ঝর্ণার মাধ্যমে খবর দিয়েও সামনে আনতে পারল না নিশীকে।সৈকত ভাবল হয়তো তার ভালবাসায় সায় দিবে না বলেই নিশী তার সামনে ভিরছে না, আবার ভাবছে হয়তো লজ্জায় সামনে আসছ না ।নানা রকম ভাবনায় এখন সৈকতের দিন কাটে ।সে এখন উদাসীনতায় ভুগছে,আগের মত হাসি আনন্দ তার মাঝে নেই কি এক বিষন্নতায় তাকে গ্রাস করেছে ।দেখলে চিন্তিত চিন্তিত মনে হয় ।ঠিকমত খাচ্ছেওনা আগের মত কথাও বলছে না কারো সাথে।এ সব মুন্না খেয়াল করে বলল-
-কি সৈকত তোর শরীর খারাপ লাগছে না কি ? সারা ক্ষন কেমন যেন মন মরা হয়ে থাকিস ?
-না, মুন্না এমনই কিছু ভাল লাগছে না ।ঢাকা ফিরবি কবে ?
-আগামী কাল, সকালের ট্রেনে । সকাল সকাল ঘুমথেকে উঠতে হবে ।
সৈকত নিশীকে যে ভালবাসার কথা জানিয়েছে তা আর মুন্নআকে বলেনী, মুন্না আবার কি ভাববে এ কারনে ।
মুন্না’র কথা শুনে সৈকতের বদন আরো মলিন হয়ে গেল ।রাতে এক প্রকার জোরর্পুবক চম্পা দ্বারা নিশী’ কে হাজির করল সৈকত সে চুরান্ত ভাবে বলতে চায় ভালবাসার কথা এবং নিশী’র মুখের কথা শুনতে চায়।নিশী ঠীকিই সৈকতের সামনে আসল কিন্তু তারদিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকল আর বলল-
– সরি, ভাইয়া আমি আপনার কথা রাখতে পারলাম না ।
– কেন নিশী আমি কি তোমার ভালবাসার যোগ্য না ?
– না , ভাইয়া এমন করে বলছেন কেন ?আমি তো অযোগ্য বলেনি,বলেছি কি আমি এখন এসব নিয়ে ভাবছি না আগে পড়ালেখা শেষ করি।এমনেই প্রেম ভালবাসা এ সব আমার পছন্দ না । আপনিও পড়া শুনা করেন আর আমিও পড়াশুনা করি এ সবে জড়ালে আর পড়াশুনা হবে না।পড়াশুনা করে সমাজে আপনি প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে “ভালবাসা আপনার কাছে আসবে ভালবাসার পিছনে আপনাকে ছুটতে হবে না’’। তখন আমি কেন আমার চেয়ে ঢের ভাল মেয়ে আপনাকে পছন্দ করবে।
– না, নিশী এসব কোন কথা আমি শোনব না ।
– আমাকে ক্ষমা করবেন ভাইয়া এতো সব পন্ডিতি পন্ডিতি কথা বলার জন্য,আমার প্রতি রাগ করবেন না আবার বেড়াতে আসবেন।
বলা শেষ হতে না হতেই বাসার ভেতরে চলে গেল নিশী।

সৈকত, নিশীর কথা গুলো শুনে বিমর্ষিত হয়ে পরল।ভালবাসা হীন এই জীবনে বেচেঁ থাকার সাধঁ মিটে গেল ।হায়!পৃথিবী তোমার বুকে মানুষ হয়ে জন্মেছি বলে আমার জীবনে কি প্রেম ভালবাসা আসবে না ? না হয় “যে মেয়েকে আমি প্রেম নিবেদন করি সে মেয়েই আমাকে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয়”।জানি না আমার বনবিথীকায় কবে বসন্ত পাখির আর্বিভাব ঘটবে , তখন কি আমি বেঁচে থাকবো? না প্রভূর সান্নিধ্যে চলে যাবো।আসলেই “প্রেম ভালবাসা এটা বিধাতার দান” ।

About এম মোস্তাকিম বিল্লাহ্

আরও দেখুন

16807761_108883132969378_7659074573731222117_n

আঞ্জুমন আরা’র দু’টি ছড়া

আঞ্জুমন আরা’র দু’টি ছড়া খুকুমনির বই মেলা।   বই মেলাতে যাবে খুকু বায়না ধরেছে, গোমরা …

Leave a Reply